[আজ আমার আব্বু না বলে না-ফেরার দেশে চলে যাবার বারো বছর হয়ে গেল …]

আমি জানি ফেসবুকে এইরকম “নিউজ”/শোক-স্ট্যাটাস প্রায়ই আসে। আমরাও গা-সওয়া হয়ে গেছে। 

তোমার ওমুকে মারা গেছে, আমি কি করতে পারি? ফাস্ট লাইফ, ফাস্ট স্ক্রলিং-ডাউন …

তবে আমার একটু বাড়তি কথা বলার আছে …

 

বাপ থাকতে আমরা বাপের মর্যাদা দেই না।

মায়ের জন্য অনেকের অনেক কথা আছে, ব্যথা আছে। ইসলামে মায়ের মর্যাদাও বেশি। কিন্তু বাপের কোনও বক্তব্য শোনার টাইম নাই।

বাবা কিন্তু শুরু থেকেই মোটামুটি unsung। সিনেমায় যেমন নায়ক/নায়িকাকে সবাই চেনে, রাস্তায় দেখলে অটোগ্রাফ নিতে দৌড়ায়, কিন্তু যে কিনা পুরা “নাটের গুরু”, পরিচালক, পাবলিকে তার কোন খাওয়া নাই।

 

সংসারে মায়ের ২৪/৭ সার্ভিস টা দেখেই সব সন্তান বড় হয়, আর বাপ সকাল বেলায় অফিস যায়, সন্ধ্যায় ঘরে আসে। আর প্রায়ই উইকেন্ডে বন্ধু বান্ধবের সাথে আড্ডা মারতে যায়।  কি করে সংসারের জন্য?

আর মাও সকাল সন্ধ্যা বাবার এই “কীর্তিকলাপ” নিজেও “তিলাওয়াত” করে, আর অটোমেটিক বাচ্চাদের “হেফজ” হয়ে যায়।

 

ওদিকে, মাথা ব্যথা নিয়েও বাবা অফিসে যায়, পায়ে হেঁটে হোক আর বাসে ঝুলে হোক; ছুটি কাটা পরবে, ছুটি কমলে ছুটি-বেচা টাকা কমে যাবে বলে। রাতে বাচ্চাকে কোলে রাখতে হয়েছে বলে অফিসে ঝিমুনি এসে যায়; এজন্যে বসের সমস্ত উচ্চবাচ্য শুনে যায় নির্বাকে, বস রাগ করলে বেতন আঁটকে যাবে বলে। 

অনেক দিনই সকালে ঘরে নাস্তা খেতে পারে না, বউ এর শরীর খারাপ বলে; একবারে অফিসের মিনি-মাগনা লাঞ্চ খেয়ে টাকা বাঁচায়। 

মাসের ২৩/২৪ তারিখে একটু সুবিধায় থাকা কলিগের কাছে হাত পেতে ধার করে বাজার চালানোর জন্য। নয়ত ভাল-স্কুলে পড়া মেয়ের বেতন আঁটকে গেছে বলে।

বাকি-চালানোর মুদী দোকানদারও পাওনার কথা বারবার জানান দিতে থাকে। কিন্তু সংসারের চুলা তো বন্ধ থাকে না। নিজে না খেলে হয়ত পেটে একটু কষ্ট হবে, ছেলেমেয়ে না খেলে তো বুকটা হুহু করবে। রাস্তার জামে পড়ে হাজার ক্লান্ত হলেও বাজারটা হাতে নিয়েই ঘরে ঢুকতে হয়। নইলে দিন শেষে আদরের বাচ্চাদের সামনে বিবিসাব “অকর্মা” পদক দিয়ে দিবে। বউএর সব ঝাড়ি বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে হজম করে যায়, সংসার এর ভাঙ্গন ঠেকাতে। বউ হুমকি দেয়, “তোমার বাড়ি” ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যাবে বলে।

কিন্তু “অপদার্থ” বাবা কখনো এই হুমকি দিতে পারে না, নিজেরও বাপের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও। নির্বাক শুনে যায়, কান্না করে শুধু বুকের ভিতর।

 

ছেলে মেয়ে বড় হয়ে যায়। আর বাবা?

আমার বাবার মতো ভালো কপাল হলে একদিন না বলে চলে যায়, আর নয়ত “স্ট্রোক” করে আরও “অপদার্থ” হয়ে যায়, কমপক্ষে প্রেশার, ডায়বেটিস এর ঔষধ হাতড়াতে থাকে।

 

আমি নিজে বাবা হবার আগে কিছুই বুঝিনি যে বাবা আসলে কি চায় … কেনও চায় …

বাবা আসলে “বকবক” করত জ্ঞান দিতে না, আমি আসলে বাবার পাশে বসব কতক্ষণ এইজন্য। কথা বলত শুধু টাইম-পাসের উসিলা হিসেবে।

বাবা মাথা টিপে দিতে বলতো পেইন-কিলার এড়ানোর জন্য না, বরং সন্তানের স্পর্শ গায়ে লাগানর জন্যে।

সুন্দরি স্ত্রীর স্পর্শের চেয়েও যে কুৎসিত সন্তানের স্পর্শ কত বেশি ভালোলাগার, সেটা বুঝার আমার সময় তখনও হয়নি।

বাবা ঔষধের কথা বলে সকালে দেরি করিয়ে দেয়, আসলে সন্তানকে যাবার সময় একটু দেখতে।

বারবার সাবধান করত, এইজন্য না যে সন্তান বোকা, বরং নিজের মরার আগে যেন সন্তানের কোনও ক্ষতি দেখতে না হয়।

সন্তানের সব কটু কথা নির্বিকারে হাসিমুখে শুনে যায়, “ছোটবেলা থেকে ও একটু পাগলা” বলে।

 

আব্বা বেচে থাকলে আমি হাতিরঝিলে ঘুরাতে নিয়ে যেতাম হাওয়া খেতে, হাত ধরে ঘুরতাম, বাদাম ছিলে দিলাম।

মাসে / দুই মাসে একদিন ভালোমন্দ খাওতাম রেস্টুরেন্টে নিয়ে, গুলশানের খোশবু, নয়ত বসুন্ধরার ক্যপ্রিকরনে।

মাথা ব্যথার কথা বললে নাপা খেতে না বলে, টাইগার বাম দিয়ে মাথায় ডলে দিতাম।

বাজারে যাবার সময় কি খেতে মনে চায়, কমপক্ষে এক দুইটা আইটেম, শুনে যেতাম।

মার্কেটের যেই মোবাইলটা বাবার ভাল্লাগে, সেই মোবাইলটা কিনে দিতাম। আমার টাকা নষ্ট করতেছি বলে বকতো, কিন্তু কিনে দিলে না জানি কি খুশি টাই না হতো।

আমার DSLR দিয়ে পিছনে ঘোলা পোরট্রেইট তুলে দিতাম।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আব্বার পাশে বসে কফি খেতাম।

 

কিন্তু,আব্বাটাই যে নাই।

সিনেমার পরিচালকের মতো। credits এ নাম আছে, কেউ খেয়াল করে নাই …